একটি সুখী পরিবার গড়ে ওঠে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, পারস্পরিক বোঝাপড়া, ত্যাগ এবং আল্লাহভীতির ভিত্তির ওপর। কিন্তু এই সুন্দর সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ভেঙে দেওয়ার জন্য সব সময় বড় কোনো ঝড়ের প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় একটি মাত্র নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যই যথেষ্ট। আর সেই বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো “আমিত্ব”—অর্থাৎ সব সময় নিজের ইচ্ছা, নিজের মত, নিজের অহং এবং নিজের স্বার্থকেই সবচেয়ে বড় মনে করা।
স্বামী বা স্ত্রী—যে-ই এই আমিত্বের শিকার হোক না কেন, তার প্রভাব পুরো পরিবারের ওপর পড়ে। কারণ সংসার কখনো একার নয়; এটি দুটি মানুষের যৌথ দায়িত্ব ও যৌথ যাত্রা। সেখানে যদি একজন সব সময় বলতে থাকেন, “আমার কথাই শেষ কথা”, “আমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত”, “আমার অনুভূতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ”—তাহলে অন্যজন ধীরে ধীরে নিজেকে অবহেলিত, অমূল্য এবং একাকী অনুভব করতে শুরু করেন।
আমিত্বের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো এটি মানুষের ভুল স্বীকার করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। তখন মানুষ নিজের ভুল দেখেও তা মানতে চায় না। বরং ভুলকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে। ক্ষমা চাওয়াকে দুর্বলতা মনে করে, আর পরামর্শ গ্রহণ করাকে নিজের মর্যাদার বিরুদ্ধে মনে করে। ফলে ছোট ছোট ভুল বোঝাবুঝি একসময় বড় দূরত্বে পরিণত হয়।
একজন মানুষ যখন নিজের ইচ্ছাকেই সবকিছুর ওপরে স্থান দেন, তখন সঙ্গীর চাওয়া-পাওয়া, কষ্ট, মানসিক অবস্থা কিংবা সম্মানের মূল্য কমে যায়। ধীরে ধীরে সম্পর্কে কথোপকথন কমে, আন্তরিকতা হারিয়ে যায় এবং ভালোবাসার জায়গা দখল করে নেয় অভিমান ও নীরবতা। বাইরে থেকে সংসার ঠিকঠাক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে সম্পর্ক ভেঙে পড়তে থাকে।
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, দাম্পত্য জীবন প্রতিযোগিতার নয়; এটি সহযোগিতার সম্পর্ক। এখানে জয়ী হওয়া মানে সঙ্গীকে হারিয়ে দেওয়া নয়, বরং একসঙ্গে জান্নাতের পথে এগিয়ে যাওয়া। রাসূল ﷺ ছিলেন বিনয়, দয়া এবং উত্তম আচরণের সর্বোত্তম উদাহরণ। তিনি কখনো অহংকারকে সম্পর্কের মাঝে স্থান দেননি। তাই মুসলিম পরিবারে আমিত্বের কোনো স্থান নেই; সেখানে স্থান হওয়া উচিত নম্রতা, পরামর্শ এবং পারস্পরিক সম্মানের।
আমিত্ব শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেই প্রভাব ফেলে না; এর ছায়া সন্তানদের ওপরও পড়ে। সন্তানরা যখন প্রতিনিয়ত ঝগড়া, একগুঁয়েমি, অসম্মান ও ক্ষমাহীন আচরণ দেখে বড় হয়, তখন তাদের মনেও সম্পর্ক সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। ভবিষ্যতে তারাও একই আচরণ নিজের জীবনে বহন করতে পারে। ফলে একটি মানুষের আমিত্ব পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, যে পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনই একে অপরকে সম্মান করেন, ভুল হলে ক্ষমা চান, প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিতে পারেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে নিজের অহংকারের চেয়ে বড় মনে করেন, সেই পরিবারে প্রশান্তি নেমে আসে। সেখানে মতের অমিল থাকতে পারে, কিন্তু মনোমালিন্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ তারা সম্পর্ককে জিতিয়ে রাখতে চান, নিজেদের অহংকে নয়।
তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত সময়ে সময়ে নিজেকে প্রশ্ন করা—আমি কি সম্পর্কটাকে বড় করছি, নাকি নিজের আমিত্বকে? আমি কি আমার সঙ্গীর কথা মন দিয়ে শুনি, নাকি শুধু নিজের কথাই শুনাতে চাই? আমি কি ক্ষমা চাইতে পারি, নাকি সব সময় নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকি?
মনে রাখতে হবে, একটি পরিবার ভেঙে যাওয়ার জন্য সব সময় দুজন মানুষের দোষ লাগে না। অনেক সময় স্বামী বা স্ত্রীর যে কোনো একজনের “আমিত্ব”ই একটি সুন্দর পরিবার ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। আর একটি সুখী পরিবার টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন মাত্র দুটি বিষয়—আল্লাহভীতি এবং “আমি” থেকে “আমরা”-তে ফিরে আসার মানসিকতা।
Related Images:


মন্তব্য করুন